কি ভাবে এস আই আকবরসহ চার পুলিশের নির্যাতনে রায়হানের মৃত্যু হয়!

  • আপডেট টাইম : May 06 2021, 05:02
  • 825 বার পঠিত
কি ভাবে এস আই আকবরসহ চার পুলিশের নির্যাতনে রায়হানের মৃত্যু হয়!
৬ জনের বিরুদ্ধে পিবিআই’র চার্জশিট

 

এস আই হাসান ও সাংবাদিক নোমান আলামত গোপন করেন

সিলেট থেকে নিজ্স্ব প্রতিবেদক।
নগরীর বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই আকবর হোসেন ভুইয়া,এ এস আই আশেক এলাহী, কনস্টেবল হারুন ও টিটু চন্দ্র দাসের নির্যাতনেই রায়হান আহমদের মৃত্যু হয়েছে। আর ফাঁড়ির টুআইসি এস আই হাসান আলী ও কোম্পানীগঞ্জের সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল নোমান এ ঘটনার আলামত গোপন করেন। আদালতে আলোচিত রায়হান হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিলের পর সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পিবিআই সিলেট বিভাগের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির এ তথ্য জানান।

গত বছরের ১১ অক্টোবর নগরীর আখালিয়া নেহারীপাড়ার বাসিন্দা রায়হান আহমদকে (৩৪) হত্যার ৬ মাস পর গতকাল বুধবার আদালতে আলোচিত এ হত্যা মামলার চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার্জশিটে উল্লেখিত ৬ জনকে আসামী করা হয়েছে। বুধবার সকাল ১১টায় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই ইন্সপেক্টর আওলাদ হোসেন অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল মুমিনের আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। পরে পিবিআই কার্যালয়ে এ নিয়ে আয়োজন করা হয় ব্রিফিংয়ের।

আসামীদের বিরুদ্ধে দন্ডবিধি ৩০২/২১০/৩৪ তৎসহ নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু নিবারণ আইন ২০১৩ এর ১৫(১)(২)(৩) ধারার অভিযোগ আনা হয়েছে। আসামীদের মধ্যে সাংবাদিক আব্দুল্লাহ আল নোমান পলাতক রয়েছে। বাকি ৫ পুলিশ সদস্য জেল হাজতে রয়েছে। জেলহাজতে থাকা কনস্টেবল তৌহিদকে চার্জশিট থেকে বাদ দেয়া হয়েছে।

তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই জানিয়েছে, এ মামলার অভিযোগপত্রসহ কেস ডকেট ১৯৬২ পৃষ্ঠার। আর কেবল অভিযোগপত্রের পৃষ্ঠা ২২। চার্জশিটে ৬৯ জন সাক্ষী রাখা হয়েছে। সাক্ষীদের মধ্যে ১০ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। রায়হান যে চেম্বারে কাজ করতো-ওই চেম্বারের চিকিৎসককেও মামলায় সাক্ষী রাখা হয়েছে।

পিবিআই’র ব্রিফিংয়ে বলা হয়, ঘটনার দিন রাতে ‘নকল ইয়াবা’ নিয়ে গোলাপগঞ্জের সাইদুল শেখ ও রনি শেখ নামের দুই ব্যক্তির সাথে ভিকটিম রায়হানের বিরোধ দেখা দেয়। এ বিরোধের জেরে রায়হান তাদেরকে মারপিট করে। এক পর্যায়ে সাইদুল শেখের কাছ থেকে একটি মোবাইল ও নগদ ৯,৭০০ টাকা নিয়ে যায় রায়হান। পুলিশের কাছে ভুক্তভোগীদের এমন অভিযোগের পর কাস্টঘরের চুলাই লালের ঘর থেকে ভিকটিম রায়হান আহমদকে উদ্ধার করে বন্দরবাজার ফাঁড়িতে নিয়ে আসা হয়। সেখানে ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই আকবর হোসেন ভূইয়া বাঁশের লাঠি দিয়ে রায়হান আহমদকে বেধড়ক মারপিট করে গুরুতর আহত করে। চিকিৎসার জন্য ওসমানী হাসপাতালে নেয়ার পর পরদিন সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। এরপর আসামীরা ভিকটিম রায়হান আহমদ কাস্টঘরে ছিনতাইকালে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন মর্মে মিথ্যা তথ্য সরবরাহ করে এবং ঘটনার সংশ্লিষ্ট আলামত ধ্বংস করে।

ব্রিফিংকালে পিবিআই’র বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির আরো জানান, রায়হানের বিরুদ্ধে ইতোপূর্বে দুটি মামলা ছিল। ২০০৮ সালে তার বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে একটি মামলা হলেও সেটি থেকে খালাস পান রায়হান। এছাড়া, তার বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে মাদক আইনেও একটি মামলা হয়েছিল। মামলাটি বর্তমানে চলমান।

তিনি জানান, আলোচিত এ মামলাটি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দাখিল করা হয়েছে এ চার্জশিট। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চার্জশিটে দাখিল করা ধারা অনুযায়ী আসামীদের সর্বোচ্চ মৃত্যুদন্ডের পাশাপাশি যাবজ্জীবন কারাদন্ডও হতে পারে। তিনি জানান, সাইদুল শেখ প্রতারণার সাথে জড়িত। তার বিরুদ্ধে আলাদা একটি মামলা চলমান রয়েছে। ব্রিফিংকালে পিবিআই সিলেট-এর পুলিশ সুপার খালেদ উজ জামান ও মামলার আইও আওলাদ হোসেনও উপস্থিত ছিলেন।

এক প্রতিক্রিয়ায় রায়হানের মা সালমা আক্তার চার্জশিটে অসন্তোষ প্রকাশ করে এ বিষয়ে আইনজীবীদের সাথে কথা বলে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন বলে জানান।

আদালতে রায়হানের মায়ের পক্ষে অভিযোগ দাখিলকারী সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার ফয়েজ উদ্দিন আহমদ জানান, তারা চার্জশিট সংগ্রহের পর তার পর্যালোচনা করবেন। তবে, এস আই আকবরসহ পুলিশ সদস্যদের আসামী রাখায় তারা সন্তুষ্ট।

আসামীদের পরিচিতি: ব্রাক্ষণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ থানার বাগইর গ্রামের মো: জাফর আলী ভুঁইয়ার পুত্র এসআই আকবর (৩২) । এছাড়া, ময়মনসিংহের নান্দাইল থানার চামারুল্লাহ গ্রামের মৃত আতাউল করিমের পুত্র এসআই আশেক এলাহী (৪৩), হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের একডালা গ্রামের আব্দুন নুরের পুত্র কনস্টেবল মো: হারুন অর রশীদ (৩২), বিয়ানীবাজার উপজেলার উক্ত চন্দ্র গ্রামের অনিল কুমার দাসের পুত্র টিটু চন্দ্র দাস(৩৮), হবিগঞ্জের মোহনপুর গ্রামের মৃত আমির হোসেনের পুত্র মো: হাসান উদ্দিন (৩২), কোম্পানীগঞ্জের বুড়দেও (শমসেরনগর) গ্রামের ইছরাইল আলীর পুত্র আব্দুল্লাহ আল নোমান (২৬)।

রায়হান হত্যার পর বন্দরাবাজার ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই আকবর হোসেনকে সাময়িক বরখাস্তের পরই কৌশলে কোম্পানীগঞ্জে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপন করে আকবর। এরপরই ভারতে পালিয়ে যায়। ৯ নভেম্বর সকালে কানাইঘাটের ডনা সীমান্ত থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। ২১ অক্টোবর এসআই হাসানকে সাময়িক বরখাস্ত করে মহানগর পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রায়হান আহমদ হত্যা মামলার তদন্তের সময় বর্ধিত করার জন্যে গত ১০ ফেব্রুয়ারি সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. আব্দুল মুমিনের আদালতে আবেদন করা হয়। ১৪ ফেব্রুয়ারি শুনানীর পর আদালত ৩০ কার্যদিবস বৃদ্ধি করেন। এরপর আরেক দফা সময় বৃদ্ধির পর গতকাল এ মামলার চার্জশিট দাখিল করা হলো।

রায়হান হত্যার পরের দিন রায়হানের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার তান্নি বাদী হয়ে কোতোয়ালী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-২০। ধারা ৩০২/৩৪ দণ্ডবিধি তৎসহ নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন ১৫(১)(২)(৩)২০১৩। প্রথমে কোতয়ালী থানার এস আই আব্দুল বাতেন মামলাটি তদন্ত করলেও ১৩ অক্টোবর মামলাটি কোতোয়ালী থানা থেকে পিবিআই’র কাছে স্থানান্তর করে পুলিশ সদর দপ্তর। প্রথমে পিবিআই ইন্সপেক্টর মহিদুল ইসলাম মামলাটি তদন্ত করেন। এরপর ইন্সপেক্টর আওলাদ হোসেনের ওপর মামলা তদন্তের দায়িত্ব পড়ে।

ময়না তদন্ত শেষে ১২ অক্টোবর রায়হানের লাশ দাফন করা হয়। পরে ১৫ অক্টোবর কবর থেকে রায়হানের লাশ উত্তোলন করে ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে পুনরায় ময়নাতদন্ত করা হয়। নির্যাতনে রায়হানের হাতের দু’টি আঙ্গুলের নখ তুলে ফেলে দারোগা আকবর। রাতভর নির্যাতনে রায়হানের শরীরে ময়নাতদন্তে ১১১টি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ১৪টি আঘাত ছিল গুরুতর। নির্যাতনের সময় রায়হানের আর্তচিৎকারে ফাঁড়ির পার্শ্ববর্তী কুদরত উল্লা রেস্ট হাউসের বর্ডারদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের পর ঘাতকদের গ্রেফতারের দাবিতে দলমত নির্বিশেষে সিলেটবাসী আন্দোলনে নামেন। সড়ক অবরোধ, মানববন্ধন, মিছিল-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। বৃহত্তর আখালিয়াবাসী ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলেন।

0Shares
এই ক্যাটাগরীর আরো খবর
January 2026
M T W T F S S
 1234
567891011
12131415161718
19202122232425
262728293031  
0Shares